ইমাম হাদি (আ.)এর কর্মতৎপরতা

ইমাম হাদি (আ.)এর কর্মতৎপরতা

ইমাম হাদি, মোতাসিম,খলিফা, খেলাফত,  সামেরা , বাগদাদ, দজলা নদী, আসকারি,

এস, এ, এ

সামেরা শহরটি মোতাসিম আব্বাসি ২২১ হিজরি বাগদাদের উত্তরে দজলা নদীর তীরে তৈরি করে এবং সেখানে সেনাঘাটি তৈরি করে আর আরবিতে সেনাঘটিকে বলা হয় আসকার। কিন্তু পরে ইমাম হাদি এবং আসকারি (আ.) সেখানে অবস্থানের কারণে উক্ত শহরটির নাম আসকারিতে রূপান্তরিত হয়।

আব্বাসিয় খলিফা মোতাসিম ইমামতের বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র করলেও ইমাম (আ.) তাদের ষড়যন্ত্রকে নস্যাত করার জন্য একাধিক পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। তিনি গোপন এবং প্রকাশ্যেভাবে উক্ত পন্থাগুলো অবলম্বনের মাধ্যমে হক্ব ও বাতিলকে সাধারণ জনগণের কাছে স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন। নিন্মে ইমাম হাদি (আ.) কিছু কর্ম তৎপরতা উল্লেখ করা হলো:

 

ইমাম হাদি (আ.) এর গোপন কর্মতৎপরতা:

১- সে যুগের আহলে বাইত (আ.)দের অনুসারিদের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখা, তাদেরকে সাহায্যে সহযোগিতা করা এবং তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দান করা।

২- পুনরায় উকিল সংস্থাকে উজ্জিবিত করা। ইমাম হাদি (আ.) তার অনুসারিদেকে নিয়ে পুনরায় উকিল সংগঠনটি তৈরি করেন। তার নির্বাচিত উকিলদের দ্বায়িত্ব ছিল সাধারণ জনগণের বিভিন্ন আকায়েদ এবং ফিকাহ শাস্ত্র সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব দেয়া বা জনগণের বক্র চিন্তাধারাকে সংশোধন করা।

৩- ইমাম হাদি (আ.)এর আপ্রাণ চেষ্টা ছিল ইমামতের প্রসঙ্গকে পুনরায় উজ্জিবিত করা। আর তাই ইমামতের সংস্কৃতিকে পুনরজ্জিবিত করার জন্য তিনি গাদিরের ইতিহাস, আহলে বাইতের ফযিলতকে বর্ণনা এবং যিয়ারতে জামে কাবিরা বর্ণনা করেছেন।

৪- সে যুগের তথাকথিত খলিফার আপ্রাণ চেষ্টা ছিল সাধারণ জনগণ যেন খলিফার দরবারি আলেমদের কাছ থেকে তাদের দৈনন্দিন মাসআলা মাসায়েল জেনে নেয়। ইমাম বুঝতে পারেন যে তারা উক্ত মাসআলা মাসায়েল বর্ণনার ছলনায় তাদেরকে বিভ্রান্ত করবে। আর এজন্য ইমাম (আ.) শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে সাধারণ জনগণের কাছে  মাসআলা মাসায়েল বর্ণনা করা থেকে নিজেকে কখনও বিরত রাখেননি।

৫- অযৌক্তিক সংশয়ের অপনোদন করা। কেননা ইমাম হাদি (আ.) এর যুগে বিভিন্ন মতাদর্শিক ও বুদ্ধিজীবীদের কর্মতৎপরতা ছিল বেশি। সুতরাং তিনি তাঁর ঐশি জ্ঞান দ্বারা তাদের সকল অযৌক্তিক সংশয়কে খন্ডন করতেন এবং সাধারণ জনগণকে তাদের ভ্রান্ত ও বক্র চিন্তাধারা সম্পর্কে অবগত করতেন।

৬- আব্বাসিয় খলিফা মোতাসিমের মৃত্যুর পরে তার সন্তান ওয়াসেক ছিল বণি আব্বাসের পরবর্তি খলিফা। কিন্তু সে ছিল খেলাফতের অযোগ্য, মদ্যপায়ি, অনভিজ্ঞ, অত্যাচারি একজন খলিফা। কেননা সে যুগে আলাভিদের সংখ্যা সামেরাতে ছিল বেশি। কিন্তু যখন মোতাওয়াক্কিল খেলাফতের পদে আসিন হয় তখন থেকে রাজনীতি অঙ্গনে এক অমানবিক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। সে ইমাম (আ.) এবং তাঁর অনুসারিদের উপরে কড়া নজর রাখা শুরু করে। আবুল ফারাজ ইস্ফাহানি বলেন: আব্বাসিয় খলিফাদের মধ্যে মোতাওয়াক্কেল ছিল সবচেয়ে নির্দয় এবং অত্যাচারি খলিফা। সে আলাভিদের উপরে অকথ্য নির্যাতন করতো।

ইমাম হাদি (আ.) তাঁর পিতা ইমাম তাকি (আ.) এর শাহাদতের পরে তাঁকে খুব কোণঠাসা এবং সংঙ্কটপূর্ণ জিবন যাপন করতে বাধ্যে করা হয়। তাঁকে সর্বদা খেলাফতের নখদর্পণে রাখা হতো এবং তাঁর সাথে সাধারণ জনগণের কোন প্রকারের সম্পর্ক রাখতে দেয়া হতো না। এমনকি মোতাওয়াক্কেল ইমাম হুসাইন (আ.)এর কবরকেও নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা চালায়।

 

ইমাম হাদি (আ.) এর প্রকাশ্যে কর্মতৎপরতা

১- ইমাম হাদি (আ.)এর জনপ্রিয়তা:

ইমাম হাদি (আ.) খেলাফতের উক্ত ষড়যন্ত্রকে নস্যাত করার জন্য খেলাফতের বিভিন্ন ব্যাক্তিদের সাথে তাঁর সখ্যতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যেমন: হারসামা যখন তাঁকে বাগদাদে নিয়ে আসে তখন বাগদাদের শাষক ছিল ইসহাক বিন ইব্রাহিম তাহেরি। সে হারসামাকে বলে তুমি কি জান যে বর্তমান শাষক কত বিদ্বেষপরায়ণ এবং হিংস্র যদি সে তাকে ইমাম (আ.)কে হত্যার জন্য ইন্ধন দাও তাহলে সে তাঁকে  হত্যা করবে। তখন হারসামা বলে: আল্লাহর শপথ আমি ইমাম (আ.) এর উত্তম শিষ্টাচারে মুগ্ধ।

 

তুরস্কের প্রিন্স ওয়াসিফ তুর্কি সে হারসামাকে বলে: যদি ইমাম (আ.)এর কোন ক্ষতি হয় তাহলে তোমাকে এর দ্বায়িত্বভার গ্রহণ করতে হবে।

 

এছাড়া খলিফার দরবারের বিভিন্ন ব্যাক্তিত্ববর্গ এবং খাদেমগণ ইমাম হাদি (আ.) যথেষ্ট সম্মান করতেন। আর এ কারণে দরবারের বিভিন্ন লোকজন উক্ত বিষয়টির প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল।

মোতাওয়াক্কেল জনসম্মুখে ইমাম (আ.)এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতো কিন্তু অপরদিকে ইমাম (আ.)কে সে নখদর্পণে রেখেছিল। কারণ কোনভাবেই যেন ইমাম (আ.) উক্ত বিষয়টি সম্পর্কে জনগণকে অবগত করতে না পারে। আর এ কারণে খলিফা ইমাম (আ.)কে মদিনা থেকে সামেরাতে আনার পথে নির্দেশ দেয় ইমাম (আ.) কে যেন সরাসরি সামেরাতে আনা না হয় বরং তাকে খানুল আসালিক নামক স্থানে যেখানে ফকির এবং দরিদ্ররা বসবাস করতো সেখানে যেন তাকে রাখা হয়।

কিন্তু ইমাম হাদি (আ.) এর একজন অনুসারি যার নাম ছিল সালেহ বিন সাঈদ সে উক্ত স্থানে তাঁর সাথে সাক্ষাত করে এবং ইমাম (আ.)কে বলে আপনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে সামেরাতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তখন ইমাম হাদি (আ.) তাকে হাতের দ্বারা একটি বৃত্ত অঙ্কন করেন এবং তাতে দৃষ্টিপাত করার নির্দেশ দেন। সালেহ বিন সাঈদ উক্ত বৃত্তের মধ্যে দেখতে পায় সেখানে একটি বাগান এবং প্রাসাদ রয়েছে। ইমাম তাকে তাঁর উক্ত অলৌকিক ক্ষমতা দ্বারা এটা বুঝাতে চান যে ইমাম (আ.)গণ যেখানেই থাকুক না কেন সেখানে তাদের জন্য সর্বদা চিরস্থায়ি বাগান এবং প্রাসাদ অপেক্ষা করছে।

 

ইমাম হাদি (আ.) এর সংরক্ষণশিল কর্মতৎপরতা:

যদিও ইমাম হাদি (আ.) এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে জিবন যাপন করছিলেন। কিন্তু তারপরেও তিনি তাঁর অনুসারিদের সাথে গোপনে যোগাযোগ রেখেছিলেন।

কুম এবং তার আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ইমাম হাদি (আ.) এর জন্য উপঢৌকন এবং যাকাত ও খুমসের অর্থ তার নির্বাচিত উকিলের কাছে একত্রিত করা হতো এবং পরে তা ইমাম (আ.) এর নির্দেশে বিভিন্ন কাজে ব্যায় করা হতো।

ইমাম (আ.) এর অনুসারিদেরকে দেখে লোকজন মনে করতো তারা হচ্ছে আলে আলির প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারি।

আবার ইমাম (আ.) এর কিছু অনুসারি এমন সংরক্ষণশিলভাবে চলাফেরা করতো যে খলিফা তাদেরকে ইমাম (আ.) এর উপরে গোয়েন্দাগিরি কাজে নিয়োজিত করেছিল।

আর এভাবেই ইমাম হাদি (আ.) তার অনুসারিদের কাছে গোপনে তাঁর বার্তা পৌছাতেন এবং তাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতেন।

 

হুকুমতের সাথে কাজ করার ক্ষেত্রে ইমাম হাদি (আ.) এর সংক্ষণশিল আচরণ:

এক ব্যাক্তি ইমাম হাদি (আ.)কে প্রশ্ন করে যদি আমাদেরকে খেলাফতের লোকজন কাজ করতে বাধ্যে করে তাহলে এক্ষেত্রে আমাদের করণিয় কি?

তখন ইমাম (আ.) তার জবাবে বলেন: যদি তোমাকে অত্যাচারি খেলাফতের লোকজন কাজ করতে বাধ্যে করে তাহলে এক্ষেত্রে আল্লাহ তোমার উক্ত অজুহাতের কারণে তোমাকে ক্ষমা করে দিবেন আর যদি তোমরা স্বেচ্ছায় অত্যাচারি খেলাফতকে সহায়তা কর তাহলে তোমাদের উক্ত কৃতকর্মকে আল্লাহ কখনই ক্ষমা করে দিবেন না।

 

খেলাফতকে প্রশ্নের সম্মুখিন করা:

ইমাম হাদি (আ.) বিভিন্ন সময়ে বণি আব্বাসিয় খলিফাদের বাস্তব ভাবমূর্তিকে সাধারণ জনগণের সম্মুখে স্পষ্ট করার লক্ষ্যে সময়ের সৎ ব্যাবহার করতেন।

মোহাম্মাদ বিন আলি বিন ঈসা আব্বাসিয় খেলাফতের একজন কর্মচারি ছিল। একদা সে ইমাম (আ.) কে জিজ্ঞাসা করে হে ইমাম! আমাকে খেলাফতের হয়ে বিভিন্ন কাজ করতে হয় এক্ষেত্রে আমার করণিয় কি?

ইমাম (আ.) তার উত্তরে বলেন: যতটুকু কাজ তারা তোমার কাছ থেকে জোরপূর্বক আদায় করে নেয়ার চেষ্টা করে তুমিও ততখানি পারিশ্রমিক ব্যাবহার করতে পার। কিন্তু তারা তোমাকে যে কাজে বাধ্যে করেনি অথচ তুমি তা স্বেচ্ছায় করেছ এর জন্য তুমি তাদের কাছ থেকে অর্থ নিতে পারবে না।

আর এভাবেই ইমাম হাদি (আ.) খেলাফতের শত বাধাকে অতিক্রম করে সাধারণ মানুষকে হক্ব ও বাতিল পথের নির্দেশনা দান করতেন।

সূত্র:

১- মাকাতেলুত তালেবিন, পৃষ্ঠা ৩৯৫।

২- আনওয়ারুল হেদায়াত, পৃষ্ঠা ৪৪৯- ৪৫০।

৩- বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৫০, পৃষ্ঠা ১৩২- ১৩৩।

৪- ওসায়েলুশ শিয়া, খন্ড ১৭, পৃষ্ঠা ১৯০।

৫- দালায়েলুল ইমামা, পৃষ্ঠা ২১৮।

 

 

নতুন কমেন্ট যুক্ত করুন