কুম শহরের বিবরণ
কুম শহরের বিবরণ
টিভি শিয়া: ইরান ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও উষ্ণতার তারতম্যের দিক থেকে বিশ্বের বিরলতম দেশগুলোর একটি। ইরানের কোম প্রদেশ একটি মরু অঞ্চল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানকার জনগণ শুষ্ক মরুর কোলে এবং লবণ মরুর পাশে নদীনালা, খালবিল ব্যবহার করে কৃষিকাজের মতো মহান পেশায় নিজেদের মশগুল রেখেছে।
তবে কোম প্রদেশের এতো খ্যাতি বা পরিচিতির কারণ ভিন্ন। কারণটা হলো এই প্রদেশেই রয়েছে আধ্যাত্মিকতার প্রাণভূমি। এখানে রয়েছে নবীবংশের সন্তান হযরত মাসুমা (সা.আ.) এর পবিত্র মাজার। তাছাড়া এই কোম শহর যে ইরানের ঐতিহাসিক ইসলামি বিপ্লবের সূতিকাগার তা কে না জানে। এ সবের বাইরেও কোম ব্যবসা বাণিজ্যের দিক থেকে বেশ স্পর্শকাতর একটি এলাকায় পড়েছে। এ দিক থেকেও কোম প্রদেশের গুরুত্ব রয়েছে বেশ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি পবিত্র কোম নগরীকে দেশটির সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন-“কোম হচ্ছে ইরানের সম্মান ও মর্যাদার প্রতিক,কারণ এই শহর হচ্ছে ইসলামী বিপ্লবের কেন্দ্র এবং এ শহরেই রয়েছে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান”।
কোম প্রদেশ ইরানের দক্ষিণ অঞ্চলে অবস্থিত। এই প্রদেশের আয়তন ১৪ হাজার বর্গকিলোমিটারের মতো। কোমের উত্তরে রয়েছে তেহরান প্রদেশ, পূর্বে সেমনান প্রদেশ, দক্ষিণে রয়েছে ইস্ফাহান প্রদেশ আর পশ্চিমে রয়েছে প্রতিবেশী কেন্দ্রীয় প্রদেশ। কোমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা কেন্দ্রীয় শহর হলো কোম। সমগ্র কোম প্রদেশে প্রায় চার ভাগের এক ভাগ ভূখণ্ড জুড়ে রয়েছে পার্বত্য এলাকা। বাকি চার ভাগের তিন ভাগই প্রান্তর। পুরো কোম প্রদেশকে তাই তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। পার্বত্য, পার্বত্য পাদদেশিয় এবং মরু প্রান্তিক। দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ভূখণ্ডেই পার্বত্য এলাকা বেশি চোখে পড়ে। এ এলাকাতেই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি। এই প্রদেশের পার্বত্য এলাকার মধ্যে শিকার নিষিদ্ধ অঞ্চল ‘পালাঙ দাররে’র কথা সবার আগে উঠে আসবে।
মরু এলাকার সাথে অবস্থানের কারণে কিংবা সমুদ্র থেকে দূরে বলে আবহাওয়ায় আর্দ্রতার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। অনেকটাই শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করে এখানে। বৃষ্টিপাতের পরিমাণও কম এই প্রদেশে। স্বাভাবিকভাবেই কোমের আবহাওয়া গ্রীষ্মের সময় ভীষণ গরম আর শীতের সময় থাকে মোটামুটি ঠাণ্ডা। সবচেয়ে বেশি ঠাণ্ডা পড়ে জানুয়ারি মাসের দিকে আর সবচেয়ে বেশি গরম পড়ে আগস্ট মাসের দিকে। গরমের উত্তাপ অনেক সময় ৭৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডেও পৌঁছে যায়। এ এলাকায় বৃষ্টিপাতের আনুমানিক পরিমাণ ১৪০ মিলিমিটার। আর বৃষ্টিপাত সাধারণত শীতকালেই বেশি হয়।
কোমে একটি নদী আছে বেশ সুন্দর। এই নদীটির নাম ‘কোমরুদ’ কিংবা ‘রুদে আনর্বর’। এই দুই নামেই বিখ্যাত নদীটি। কোম শহরের ঠিক মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে এই নদী। কোমরুদ নদীটির উৎস হলো জাগরোস পর্বতমালার ‘জার্দকুহ বাখতিয়রি’ পাহাড়। এই পাহাড় থেকে সৃষ্টি হয়ে ২৮৮ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত বয়ে গেছে নদীটি। নদীর চলার পথে পড়েছে অনেক শহর যেমন ‘গুলপয়গন’ ও ‘মাহাল্লত’ শহর। এসব শহর পেরিয়ে কোম প্রদেশের একেবারে পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত কোম হ্রদ পর্যন্ত চলে গেছে নদীটি। চলার পথে পথে বহু নাম ধারণ করেছে নদীটি।
কোম হ্রদটিও আরেকটি নামে পরিচিত। তার অপর নাম হলো ‘হউজে সুলতান’। এক শ বিশ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট এই হ্রদটি তেহরান-কোম মহাসড়কের পূর্বকোল জুড়ে অবস্থিত। কোম হ্রদের পশ্চিম অংশে সবসময় পানি থাকে। তবে পূর্বের অংশটি লবণ হ্রদ। হ্রদটি শুকনো সময়ে জলাভূমিতে পরিণত হয় কিন্তু বাকি সময়ে পানিতে পূর্ণ থাকে। কোম প্রদেশে বেশ উঁচু উঁচু বহু পাহাড় রয়েছে। সবুজ গাছ গাছালি আর এই উঁচু নিচু পাহাড়ের সারি কোমের প্রাকৃতিক পরিবেশটাকে করে তুলেছে দৃষ্টিনন্দন। এখানকার সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টির নাম ‘তাখতে সারহৌজ’। উচ্চতা হলো তিন হাজার এক শ তিরানব্বুই মিটার। কোম প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর কোম থেকে ৪৭ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই পাহাড়টি। কোমের পশ্চিমেও রয়েছে একটি উঁচু পাহাড়। এর নাম ‘ইয়াজদন’ পাহাড়। এছাড়া আরও বহু পাহাড় আছে এই প্রদেশে।
কোমের অর্থনীতির মূল উৎস হলো কৃষিকাজ, পশুপালন, হস্তশিল্প এবং মেশিনে তৈরি বিচিত্র শিল্প। ফলের বাগানও রয়েছে প্রচুর। আখরোট, বাদাম, যার্দালু, চেরি ব্যাপক পরিমাণে হয় এখানে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদনের বিরাট একটি অংশ শুকিয়ে রপ্তানিও করা হয়। এসবের বাইরেও গম, তুলা, সব্জি, যব, বিট, ভুট্টা, সূর্যমুখীর বিচি যেমন উৎপন্ন হয় তেমনি আনার, মিষ্টি ডুমুরের মতো বিচিত্র ফলও এখানকার বাগানে উৎপন্ন হয়। খনিজ সম্পদেও বেশ সমৃদ্ধ কোম। এই সম্পদকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই এখানে গড়ে উঠেছে বহু শিল্প কলকারখানা।
কোমে আরও রয়েছে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বহু স্থাপনা। অন্তত ৩১৭টি নিদর্শন রয়েছে কোমে। ধর্মীয় স্থাপনা ও নিদর্শন যারা পর্যটন করে অভ্যস্ত তাদের জন্য কোম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার প্রসঙ্গে অবশ্যই মাসুমা (সা) এর মাজারের কথা উল্লেখ করতে হবে। এই মাজারের বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যাবে না। পবিত্র এই স্থাপনাটি পরিদর্শন করে নিজেকে আধ্যাত্মিক সুষমায় সমৃদ্ধ করতে ভুলবেন না আশা করি।
নতুন কমেন্ট যুক্ত করুন