ফকিহের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের তাৎপর্য

ফকিহের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের তাৎপর্য

 পারিভাষিক অর্থে‘ বেলায়াত্’ (ولايت ) মানে হচ্ছে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের ওপর কারো অভিভাবকত্ব বা শাসন-কর্তৃত্ব। প্রকৃত পক্ষে বেলায়াত হচ্ছে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের কোনো ব্যপারে অন্য কারো হস্তক্ষেপ বা তার মতামত বাস্তবায়ন।

দ্বীনী জ্ঞানের পরিভাষায়‘ ফকীহ্’ (فقيه ) হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি দ্বীন সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন এবং ইসলামী হুকুমাতের দৃষ্টিকোণ সম্পর্কেও পরিপূর্ণরূপে অবহিত। এছাড়া তার অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের অন্যতম হচ্ছে এই যে,তিনি ইসলাম সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ এবং আত্মিক,নৈতিক ও মানসিক দিক থেকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য উন্নত অবস্থানের অধিকারী; তার সত্তায় এমন কতক গুণাবলী স্থায়ীভাবে নিহিত  যা তাকে গুনাহ্ ও নাফরমানী থেকে ফিরিয়ে রাখে এবং এর ফলে তিনি প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বেঁচে থাকেন। এ ধরনের উন্নত ও লক্ষণীয় গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য সমূহকে সমন্বিতভাবে‘ ইদালাত্ (عدالت -  ভারসাম্যতা,নীতিনিষ্ঠতা,ন্যায়ানুগতা) বলা হয়।

কোনো ব্যক্তির মধ্যে যখন ফিক্বাহাত্ (فقاهت -দ্বীনী জ্ঞানের বিশেষজ্ঞত্ব ও দ্বীনী যুগজিজ্ঞাসার জবাব দানের যোগ্যতা) ও‘ ইদালাত্ থাকে অর্থাৎ একই সাথে দ্বীনী জ্ঞানে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের পাণ্ডিত্ব ও তা অনুসরণের ক্ষেত্রে ঐকান্তিকতা ও নিষ্ঠা ব্যাপক ও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় তৈরী হয়ে যায় এবং সেই সাথে তার মধ্যে সমাজ পরিচালনার জন্যেও যথেষ্ট যোগ্যতা তৈরী হয়ে যায়,তখন তিনি বেলায়াতের অধিকারী হন।

‘ বেলায়াত্’ পরিভাষাটি যখন‘ ফাক্বীহ্’ পরিভাষার সাথে যুক্ত করে ব্যবহার করা হয় অর্থাৎ পরিভাষা হিসেবে‘ বেলায়াতে ফাক্বীহ্’ বলা হয়,তখন তার মানে হয় সমাজ বা রাষ্ট্রের ওপর ফকিহর শাসন ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব। বস্তুতঃ যে কোনো সমাজের জন্যই বৃহত্তর ও সামষ্টিক বিষয়াদি পরিচালনার জন্য উল্লেখযোগ্য ও বিশিষ্ট গুণাবলীর অধিকারী শাসক ও কর্তৃত্বশালীর প্রয়োজন হয়,ইসলামী সমাজে যে ধরনের গুণ-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী শাসক ও পরিচালকের প্রয়োজন পারিভাষিকভাবে তাকে বেলায়াতে ফকীহ্ বলা হয়।

আর এ শাসন-কর্তৃত্ব‘ নিরঙ্কুশ’ হওয়ার মানে হচ্ছে এই যে,সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে সব ক্ষমতা ও এখতিয়ারের প্রয়োজন তিনি পূর্ণ মাত্রায় তার অধিকারী হবেন।

এ আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট যে,ফকিহর নিরঙ্কুশ শাসন-কর্তৃত্ব মানে হচ্ছে ফকিহ শাসক এমন এক ব্যক্তি যিনি ইসলামী হুকুমাত পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতার অধিকারী এবং‘ ইলম,তাক্ওয়া ও সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় মা‘ ছূমগণের (আ.) অধিকতর নিকটবর্তী ও হুকুমাত প্রতিষ্ঠায় সক্ষম। এরূপ ব্যক্তি সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে মা‘ ছূমগণের (আ.) সমস্ত এখতিয়ারের অধিকারী হবেন এবং তার অনুমতি ব্যতীত কোনো আইনই কার্যকারিতা ও বৈধতার অধিকারী হবে না। তার অনুমতি ব্যতীত কেউই আইন বাস্তবায়নের অনুমতি পাবে না। বরং রাষ্ট্রের সকল কাজকর্মই তার অনুমতি সাপেক্ষে সম্পাদিত হবে।

হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ)‘ ফকীহ্ শাসকের বিভিন্ন দিক ও এখতিয়ার সমূহ’ (شؤون و اختيارات ولی فقيه ) গ্রন্থের ৩৩ নং পৃষ্ঠায় বলেনঃ“ এ দু’ টি বৈশিষ্ট্যের (আল্লাহর আইনের জ্ঞান ও‘ ইদালাত্) অধিকারী কোনো সুযোগ্য ব্যক্তি যদি উত্থিত হন এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন সে ক্ষেত্রে হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে যে কর্তৃত্বের (বেলায়াত্) অধিকারী ছিলেন,তিনি সেই একই কর্তৃত্বের অধিকারী এবং সকল জনগণের জন্য তার আনুগত্য করা অপরিহার্য।”

হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ) তার‘ বেলায়াতে ফকীহ্’ গ্রন্থের ৪০ নং পৃষ্ঠায় বলেনঃ“ হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর হুকুমাতী এখতিয়ার আমীরুল মু’ মিনীন হযরত আলী (আ.)-এর হুকুমাতী এখতিয়ারের চেয়ে বেশী ছিলো বা হযরত আলী (আ.)-এর হুকুমাতী এখতিয়ার ফকীহর হুকুমাতী এখতিয়ারের চেয়ে বেশী ছিলো -এরূপ ধারণা পুরোপুরি ভ্রান্ত ও পরিত্যাজ্য।”

হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ)-এর বাণী ও বক্তব্যের সংকলন‘ ছাহীফায়ে নূর’ -এর ৬ষ্ঠ খণ্ডের ৫১৯ নং পৃষ্ঠায় তার যে উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে তাতে এ বিষয়টি অধিকতর সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে হযরত ইমাম বলেনঃ“ যদিও আমার দৃষ্টিতে এটা (ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধান) কিছুটা ত্রুটিপূর্ণ এবং এতে যা বলা হয়েছে ইসলামে ওলামায়ে কেরামের এখতিয়ার তার চেয়েও বেশী; মূলতঃ এই বুদ্ধিজীবীরা যাতে বিরোধিতা না করে সে লক্ষ্যে মহোদয়গণ এ ব্যাপারে কিছুটা ছাড় দিয়েছেন। এ সংবিধানে যা উল্লিখিত হয়েছে তা বেলায়াতে ফকীহর কতক দিক মাত্র,সকল দিক নয়। এত সব শর্ত সহকারে যে এটি নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে তার সবই একটি বিষয়ের শর্তাবলী -যা তারা অত্যন্ত ভালোভাবে নির্ধারণ করেছেন; আমরাও এটা মেনে নিচ্ছি। কিন্তু বিষয় এটা নয়,বরং বিষয়টি এর চেয়েও অনেক বড়।”

ফকীহ্ বা মুজতাহিদের নিরঙ্কুশ শাসন-কর্তৃত্বের তাৎপর্য এটাই। ফকীহ্ হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর সেই হুকুমাতী এখতিয়ারের অধিকারী। আল্লাহ্ তা‘ আলার পক্ষ থেকে বিশেষভাবে মনোনীত নবী ও ইমামগণ (আ.) নবুওয়াত ও ইমামতের আসনে বসে যে সব সুনির্দিষ্ট এখতিয়ারের অধিকারী,ফকীহ্ ইসলামী সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে সেই অভিন্ন এখতিয়ারের অধিকারী।

হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ) তার আল-বাই‘ (البيع - ক্রয়-বিক্রয়/ ব্যবসায়) গ্রন্থে বেলায়াতে ফকীহ্ সংক্রান্ত আলোচনায় বলেছেনঃ“ রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারণ সংক্রান্ত যে সব বিষয়ের এখতিয়ার হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) ও ইমামগণের (আ.) জন্য প্রযোজ্য,তার সবই‘ আদেল (ন্যায়বান ও ভারসাম্যের অধিকারী) ফকীহর জন্য প্রযোজ্য এবং বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে এতদুভয়ের এখতিয়ারের মধ্যে কোনোই পার্থক্য করা সম্ভব নয়।”

‘ ছাহীফায়ে নূর’ গ্রন্থের ৬ষ্ঠ খণ্ডের ২৩৭ নং পৃষ্ঠায় হযরত ইমামের যে উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে তাতে তিনি বলেনঃ“ পরিপূর্ণ শর্তাবলীর অধিকারী ফকীহ্গণ মা‘ ছূমগণের (আ.) পক্ষ থেকে শরয়ী,রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের সকল বিষয়ে প্রতিনিধিত্বের অধিকারী এবং হযরত ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আত্মগোপনরত অবস্থায় থাকার যুগে সকল বিষয়ই তাদের ওপর অর্পিত।”

স্বয়ং মা‘ ছূমগণ (আ.) ফকীহদের এই বেলায়াত বা শাসন-কর্তৃত্বের অধিকারকে‘ নিরঙ্কুশ’ বলেছেন। অতএব,পরিপূর্ণ শর্তাবলীর অধিকারী ফকীহদের নিকট থেকে এ বৈশিষ্ট্যকে,বরং এ এখতিয়ারকে ফিরিয়ে নেয়া তারা (মা‘ ছূমগণ) ছাড়া অন্য কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধানে যে সব ত্রুটি ছিলো ১৩৬৮ ফার্সী সালে (১৯৮৯ খৃস্টাব্দে) হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ)-এর নির্দেশে সংবিধান পর্যালোচনা পরিষদ কর্তৃক তা দূরীভূত করা হয় এবং এ সংশোধনীতে সংবিধানের ৫৭ নং ধারার‘ নির্দেশ দানের কর্তৃত্ব’ (ولايت امر ) সংশোধন করে তদস্থলে‘ নির্দেশ দানের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব’ (ولايت مطلق امر ) লেখা হয়। সংবিধানের সংশোধন,পরিবর্তন ও সম্পূরণ ১৯৮৯ খৃস্টাব্দের ২৮শে জুলাই তারিখে অনুষ্ঠিত গণভোটে ইরানী জনগণ কর্তৃক অনুমোদিত হয় এবং এর ফলে তখন থেকে কার্যতঃ‘ নির্দেশ দানের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব’ (ولايت مطلق امر ) আইনগত রূপ পরিগ্রহণ করে।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধানের এ মূলনীতিটি সংবিধানের ১১০ নং ধারাকে প্রভাবিত করে। সংবিধানের ৫৭ নং ধারা অনুযায়ী ফকীহ শাসকের শাসন-কর্তৃত্ব হচ্ছে নিরঙ্কুশ। অতএব,সংবিধানের ১১০ নং ধারায় যে ফকীহ শাসকের ১১টি এখতিয়ার বর্ণিত হয়েছে সে কারণে তার পুরো শাসন-কর্তৃত্ব এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ বুঝায় না। বলা বাহুল্য যে,যে কোনো সীমাবদ্ধতাই তার বিরোধিতার তাৎপর্য বহন করে,কিন্তু সংবিধানের ৫৭ নং ধারা হচ্ছে নিরঙ্কুশ।

অতএব,শরীয়ত,বিচারবুদ্ধি ও সংবিধানের দৃষ্টিতে আমরা ফকীহ্ বা ফকীহ শাসকের নিরঙ্কুশ শাসন-কর্তৃত্বে বিশ্বাসী। আমাদের মহান মরহূম ইমামও ফিক্বহী দৃষ্টিকোণ বা বিচারবুদ্ধি ও শরীয়তের দলীলের ভিত্তিতে বলেনঃ“ নবী ও ইমামগণের (আ.) জন্য যত রকমের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক দায়িত্ব নির্ধারিত আছে তার সবই‘ আদেল ফকীহর জন্য নির্ধারিত।”

এর ভিত্তিতেই আমরা মনে করি,ফকীহ শাসকের অনুমোদন ব্যতীত কোনো আইন-কানুনই বৈধতা ও কার্যকরিতার অধিকারী নয় এবং সমগ্র রাষ্ট্রীয় কাজকর্মই তার অনুমতিক্রমে পরিচালিত হয়।(এর মানে এ নয় যে,প্রতিটি আইনেই তার স্বাক্ষর থাকতে হবে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি কাজের জন্যই স্বতন্ত্রভাবে তার নিকট থেকে অনুমতি নিতে হবে। বাস্তবতার দৃষ্টিতেও একজন মানুষের পক্ষে এত কাজ সম্পাদন সম্ভব নয়। বরং এর মানে হচ্ছে এই যে,নীতিগতভাবে সকল রাষ্ট্রীয় কাজ তার পক্ষ থেকেই সম্পাদন করা হবে এবং তিনি সব কিছুর প্রতি দৃষ্টি রাখবেন। প্রত্যেকেই তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি কারো কোনো কাজে আপত্তি না করেন ততক্ষণ পর্যন্ত সে কাজে তার অনুমোদন বা অনুমতি আছে বলে গণ্য হবে। তিনি যদি কখনো কারো কোনো কাজে দ্বিমত করেন বা হস্তক্ষেপ করেন সে ক্ষেত্রে অবশ্যই তার মতই কার্যকর হবে। এটাই হচ্ছে এ তত্ত্বের প্রায়োগিক দিক) এমনকি জনগণের রায়ও কেবল তখনি মূল্যবান হয় যখন তা মুজতাহিদ ফকীহ্ কর্তৃক অনুমোদিত হয় (ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে এ ধারণার প্রায়োগিক দিক একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তব রূপ লাভ করে। তা হচ্ছে,নির্বাচিতব্য পদগুলোতে কারো নির্বাচন প্রার্থী হওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড রাখা হয়েছে যার আলোকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কাউকে প্রার্থী হবার অনুমতি দেয়া হয়। (বলা বাহুল্য যে,সব দেশেই এ ব্যাপারে কতক মানদণ্ড রয়েছে,যেমন ঃ ফৌজদারী অপরাধে শাস্তি প্রাপ্তদেরকে একটি সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রার্থী হতে না দেয়া।) এর মানে হচ্ছে,যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের সকলেই ঐ দায়িত্বের জন্য উপযুক্ত,অতএব,তাদের মধ্য থেকে যিনিই নির্বাচিত হোন না কেন তার নির্বাচনে ও দায়িত্ব গ্রহণে মুজতাহিদ শাসকের অনুমোদন রয়েছে বলে গণ্য হবে),

তা সে মুজতাহিদ ফকীহ্ হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ) হোন,অথবা হযরত আয়াতুল্লাহ্‘ উযমা সাইয়েদ আলী খামেনেয়ীই হোন - এতে কোনোই পার্থক্য নেই।

‘ ছাহীফায়ে নূর’ গ্রন্থের নবম খণ্ডের ২৫৩ নং পৃষ্ঠায় হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ)-এর যে উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে তাতে তিনি বলেনঃ“কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সরকার যদি ফকীহ শাসকের অনুমতিক্রমে প্রতিষ্ঠিত না হয় বা ফকীহ শাসকের দ্বারা মনোনীত না হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বা ক্ষমতায় আরোহণ করে,তাহলে তা তাগূত।”

অতএব ফকীহ শাসক কর্তৃক নিয়োজিত না হয়ে থাকলে প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টও একজন তাগূত।

বস্তুতঃ ফকীহ শাসক হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর সকল রাষ্ট্রীয় এখতিয়ারের অধিকারী হবেন। প্রকৃত পক্ষে ফকীহ শাসকের হুকুমাত হচ্ছে স্বয়ং হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর নিরঙ্কুশ শাসন-কর্তৃত্বেরই একটি শাখা মাত্র,আর তার শাসন-কর্তৃত্ব ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ের হুকুম সমূহের (প্রাথমিক পর্যায়ের বা প্রথম স্তরের হুকুম সমূহ (احکام اولية ) একটি ফিক্বহী পরিভাষা। এর মানে হচ্ছে ইসলামের মৌলিকতম বিধান যার অবস্থান শাখা-প্রশাখাগত হুকুম সমূহের উর্ধে এবং এ কারণে কোনো শাখাগত হুকুমের সাথে তার সাংঘর্ষিকতা দেখা দিলে মৌলিক বিধানই কার্যকর হবে। উদাহরণ স্বরূপ,ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যক্তির জীবন সম্মানীত এবং ব্যক্তির সম্পদের ওপর তার অধিকার নিরঙ্কুশ। কিন্তু ইসলামী হুকুমাতের হেফাযত ও কল্যাণ তার চেয়েও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে অপরিহার্য বিবেচিত হলে ইসলামী শাসক তাকে যুদ্ধে পাঠাতে পারবে যা তার জীবনকে হুমকির সম্মুখীন করে এবং তার বৈধ সম্পদ হুকুম দখল,বাযেয়াফত বা জাতীয়করণ করতে পারবে। অন্যদিকে ইসলামী হুকুমাত প্রয়োজন বোধে ইসলামের কোনো অকাট্য বিধানের কার্যকরীকরণ সাময়িকভাবে সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত রেখে বা সীমাবদ্ধ করে রাষ্ট্রীয় বিধান জারী করতে পারে যা কেবল ঐ বিশেষ সময়ে বা ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতির অবসান ঘটলে বা আইনটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে উক্ত রাষ্ট্রীয় আইনটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং মূল বিধানটি কার্যকর হবে। এ ক্ষেত্রে উক্ত রাষ্ট্রীয় আইনটি দ্বিতীয় স্তরের হুকুম (حکم ثانوية ) বলে গণ্য হবে। উদাহরণ স্বরূপ,শরীয়তের মূল বিধান অনুযায়ী যে সব নর-নারীর মধ্যে বিবাহ বৈধ প্রয়োজনে ইসলামী হুকুমত তাদের বিবাহে বাধা দিতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ,ইসলামী রাষ্ট্র শত্রুভাবাপন্ন দেশের নাগরিকের সাথে অনির্দিষ্ট কালের জন্য এবং যুদ্ধকালে সাময়িকভাবে যে কোনো ভিনদেশী নাগরিকের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকের বিবাহ নিষিদ্ধ করতে পারে।)

অন্যতম হিসেবে পরিগণিত - যা সমস্ত শাখা-প্রশাখাগত আহ্কামের ওপর,এমনকি নামায,রোযা ও হজ্বের ওপর অগ্রাধিকার রাখে। যেখানেই ইসলামী সমাজের কল্যাণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন হবে সেখানেই তিনি শরীয়ত ও ইসলামী মৌল নীতিমালার ভিত্তিতে তার শাসন-কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারবেন। বস্তুতঃ ফকিহ শাসকের অবস্থান সকল রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি ও কাজকর্মের ওপরে এবং সকল কাজই তার অনুমতিক্রমে ও তার অনুমতির ছায়াতলে বৈধতা লাভ করে।

হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্ঃ) তার‘ বেলায়াতে ফকীহ্’ গ্রন্থের ৬৫ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেনঃ“ ফকীহ্গণ হচ্ছেন হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর দ্বিতীয় স্তরের অছি এবং হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর পক্ষ থেকে ইমামগণের (আ.) ওপর যে সব দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে তা তাদের জন্যও কার্যকর হবে। অতএব,তাদেরকে হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর সকল কাজকর্মই সম্পাদন করতে হবে।”

আমরা এই প্রকৃত অবস্থাকেই ফকীহর নিরঙ্কুশ শাসন-কর্তৃত্ব হিসেবে গণ্য করি। আমরা মনে করি,হযরত ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর দীর্ঘ কালীন অন্তর্ধানের যুগে (শিয়া ও সুন্নী উভয় মাযহাবের আক্বিদাহ্ অনুযায়ী,বিশ্ব যুলুম-অত্যাচার,অবিচার ও অন্যায়-অনাচারে পূর্ণ হয়ে যাবার পর মানবতাকে মুক্তি দানের লক্ষ্যে হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর বংশে একজন মুক্তিদাতার আবির্ভাব হবে; তিনি হযরত ইমাম মাহ্দী (আ.) নামে সুপরিচিত হবেন। তিনি যুলুম-অত্যাচার,অবিচার ও অন্যায়-অনাচারের অবসান ঘটিয়ে বিশ্বব্যাপী ইসলামী হুকুমাত প্রতিষ্ঠা করবেন এবং তখন বিশ্ব সুবিচার ও নেয়ামতে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। শিয়া মাযহাবের আক্বিদাহ্ অনুযায়ী,আহলে বাইতের ধারাবাহিকতায় আগত দ্বাদশ ইমামই (জন্ম হিজরী ২৫৫ সাল) হচ্ছেন হযরত ইমাম মাহ্দী (আ.); আল্লাহ্ তা‘ আলা হযরত খিজির (আ.)-এর ন্যায় তাকে দীর্ঘজীবী করেছেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি আত্মগোপনরত অবস্থায় আছেন। তিনি স্বীয় পরিচয় গোপন রেখে জনসমাজে বিচরণ করছেন,তবে স্বীয় মতামত দিয়ে সমাজকে,বিশেষ করে সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রভাবিত করছেন। উপযুক্ত সময়ে তিনি আত্মপ্রকাশ এবং মুসলমানদের নেতৃত্ব ও শাসন-কর্তৃত্ব গ্রহণ করবেন,এরপর ইসলামী বিশ্ববিপ্লবে নেতৃত্ব দেবেন। তার এখন থেকে হাজার বছরেরও বেশী কাল পূর্বে জন্মগ্রহণ ও দীর্ঘজীবী হওয়ার ধারণা অবশ্য আহলে সুন্নাতের ওলামায়ে কেরামের নিকট গৃহীত হয় নি। তাদের ধারণা,তিনি এখনো জন্মগ্রহণ করেন নি। অবশ্য আহলে সুন্নাতের তথ্যসূত্র সমূহেও হযরত ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আত্মপ্রকাশ,মুসলমানদের নেতৃত্ব ও শাসন-কর্তৃত্ব গ্রহণ এবং ইসলামী বিশ্ববিপ্লবে নেতৃত্ব প্রদানের কথা আছে; তার আত্মপ্রকাশপূর্ব জীবন সম্পর্কে কিছুই বলা হয় নি। এ থেকে আত্মপ্রকাশের পূর্বে তার জনসমাজে অপরিচিত থাকার ধারণাই প্রমাণিত হয়,তা তার সে জীবন পঞ্চাশ,একশ’ বা হাজার বছর বা তার চেয়েও বেশী -যা-ই হোক না কেন। তবে হযরত ইমাম মাহ্দী (আ.) জন্মগ্রহণ করেছেন কি করেন নি - সে বিতর্কের ফয়সালার ওপর বেলায়াতে ফকীহ্ বা মুজতাহিদের শাসনের অপরিহাযতা নির্ভরশীল নয়। কারণ,উভয় অবস্থায়ই ইমাম (আ.)-এর আত্মপ্রকাশের পূর্বে মুসলমানরা মুজতাহিদের শাসনের মুখাপেক্ষী।)

 ফকীহ শাসক হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) ও মা‘ ছূম ইমামগণের (আ.) ন্যায় জনগণের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল কাজকর্মে নিয়ন্ত্রণ,পরিচালনা ও হস্তক্ষেপের অধিকারী।

 

নতুন কমেন্ট যুক্ত করুন