দাওয়াতে যুল আশিরার ঘটনা
দাওয়াতে যুল আশিরার ঘটনা
দাওয়াতে যুল আশিরাহ’র ঘটনাটি ইসলামী ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্ববহ একটি ঘটনা। কেননা এ ঘটনার পরই রাসূল (সঃ) আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত দ্বীন ইসলামের প্রচার ব্যাপকভাবে এবং প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষের মাঝে শুরু করেন। এর পূর্বে মুষ্টিমেয় কিছু লোককে গোপনে তিনি দাওয়াত দিয়েছিলেন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, এই দাওয়াতে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিজের ভবিষ্যত প্রতিনিধি ও ওসী নির্ধারণ করেন এবং এ দাওয়াতের অনুষ্ঠানেই রাসূল (সঃ) এর ইন্তেকালের পর ইসলামে আলী (আঃ) এর পদমর্যাদার বর্ণনা দেয়া হয়। আর এ কারণে এ ঘটনা মুসলিম উম্মাহ’র ভবিষ্যত নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনস্বীকার্য ভূমিকার অধিকারী। এ লক্ষ্যে প্রথমে দাওয়াতে যুল আশিরার মূল ঘটনাটি ঐতিহাসিকরা যেভাবে উল্লেখ করেছেন সেভাবে তুলে ধরা হল।
হযরত রাসূলুল্লাহ (সঃ) নবুয়্যত প্রাপ্তির প্রথম তিন বছর গোপনে তাওহীদের (একত্ববাদের) প্রতি আহ্বানের জানান। আর এ সময়ে তিনি প্রকাশ্য দাওয়াত প্রদান হতে বিরত ছিলেন। কেননা প্রথম দিন হতেই প্রকাশ্য দাওয়াত প্রদান রেসালতের প্রচারের পথে আরো অধিক বাধার জন্ম দিত। কাজেই তিনি গোপনে বিশেষ যোগাযোগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু লোককে একত্ববাদের প্রতি আহ্বান জানান। ফলে মুষ্টিমেয় কিছু লোক ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
কুরাইশ অধিপতিরা রাসূল (সঃ) এর দাওয়াত ও প্রচার সম্পর্কে কমবেশী অবগত থাকা সত্বেও তারা কোন রকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নিজেদের আরাম-আয়েশের জীবনেই মগ্ন ছিল। রাসূল (সঃ) এই সুযোগে নিজের মুষ্টিমেয় সাহাবীদের নিয়ে মক্কার আশে পাশের উপত্যকাগুলোতে যেতেন এবং মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে নামায আদায় করতেন। মুশরিকদের কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করলে রাসূলের (সঃ) সাহাবী এবং মুশরিকদের মাঝে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়, যার ফলে সায়াব ইবনে ওয়াকাসের হাতে এক মুশরিক আহত হয়। আর এ কারণেই আল্লাহর রাসূল (সঃ) আরকামের গৃহকে ইবাদতের স্থান হিসেবে নির্ধারণ করেন।
তিনি এই তিন বছর নিজের সকল আত্মীয়-স্বজনকে পর্যন্ত দাওয়াত দেননি। শুধুমাত্র বিশেষ ব্যক্তিদের সাথে গোপনে যোগাযোগ রেখে চলতেন। এই তিন বছরে যেমন তিনি কুরাইশদের মূর্তি সম্পর্কে কোনরূপ উক্তি করেননি তেমনি কুরাইশরা তাঁর এই কাজে বাঁধ সাধেনি।
কিন্তু যেদিন থেকে তিনি প্রকাশ্য দাওয়াত দিতে আরম্ভ করলেন এবং মূর্তি ও জাহেলিয়্যাতের মনুষ্যত্ব বিরোধী প্রথাসমূহের যে সমালোচনা তিনি করলেন তা প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে রটে গেল। তখন কোরাইশ অধিপতিরাও সজাগ হলো। অতঃপর তারা প্রকাশ্যে হযরত মহানবীর (সঃ) বিরোধিতা করতে আরম্ভ করলো। আর তখনই তিনি তাঁর তিন বছরের নিরবতাকে আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে ভাঙ্গলেন এবং আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে প্রকাশ্য দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। আর স্বয়ং মহান আল্লাহর নির্দেশেই তিনি এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। মহান আল্লাহর পক্ষ হতে জীবরাঈল (আঃ) ওহী নিয়ে অবতীর্ণ হলেন:
﴿وَ أَنذِر عَشِيرَتَکَ الأَقرَبِينَ﴾
“নিজের আত্মীয়-স্বজনকে আল্লাহর আযাব হতে ভীতি প্রদর্শন করো।” (সূরা শুআরা, ২১৪)
সেদিন রাসূলের (সঃ) দাওয়াত দেয়ার পদ্ধতি ছিল খুবই লক্ষ্যণীয়। সেদিন একটি বিষয় সুস্পষ্ট ছিল, পরবর্তীকালে যা আরো স্পষ্টতর হয়।
মুফাসসিরগণ ﴿وَ أَنذِر عَشِيرَتَکَ الأَقرَبِينَ﴾ এই আয়াতের তাফসীরে এবং ঐতিহাসিকগণও প্রায় ঐকমত্য হয়ে এভাবে লিখেছেন যে, মহান আল্লাহ তাকে নির্দেশ দিলেন নিজের আনিত দ্বীনের প্রতি নিজের আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত দিতে। রাসূল (সঃ) সর্বদিকে লক্ষ্য রেখে আলীকে (আঃ) নির্দেশ দিলেন ভোজের আয়োজন করতে এবং সাথে দুধের ব্যবস্থাও করতে বললেন। তখন আলী (আঃ) এর বয়স ছিল মাত্র ১৩ এবং কোন কোন বর্ণনামতে ১৫ বছর। অতঃপর তিনি বণি হাশিমের ৪৫ জন গণ্যমান্য ব্যক্তি দাওয়াত করলেন এবং সিদ্ধান্ত নিলেন যে, মেহমানদের খাবার পরিবেশনের ফাঁকে গোপন বিষয়টি সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করবেন। কিন্তু দুঃখ জনকভাবে খাওয়া দাওয়ার পর তাঁর কোন কথা বলার পূর্বে তাঁরই এক চাচা (আবু লাহাব) নিজের ভিত্তিহীন ও উদ্ভট কর্থাবার্তার মাধ্যমে মজলিসের মধ্যে হৈ চৈ সৃষ্টি করে মজলিসে কথা বলার পরিবেশ নষ্ট করে দিল। পয়গম্বর (সঃ) এটাকেই উত্তম মনে করলেন যে, বিষয়টি নিয়ে আগামীকাল আলোচনা করবেন। অতঃপর তিনি পরদিন পূনরায় দাওয়াত দিলেন এবং আরেকটি ভোজের আয়োজন করলেন। আহারের পর স্বীয় গোত্রের গণ্যমান্য লোকদের উদ্দেশ্যে আল্লাহর প্রসংশা এবং তার একত্ববাদের স্বীকৃতি দিয়ে নিজের বক্তব্য শুরু করলেন। তিনি বললেন :
“নিঃসন্দেহে একটি দলের পথপ্রদর্শক তার লোকদেরকে মিথ্যা বলে না; সেই আল্লাহর কসম যিনি ছাড়া আর কোন প্রভূ নেই, আমি তোমাদের এবং বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে আল্লাহ কতৃক প্রেরিত হয়েছি। হে আমার আত্মীয়-স্বজন, তোমরা ঘুমন্ত ব্যক্তিদের ন্যায় মৃত্যুবরণ করবে এবং জীবতদের ন্যায় জেগে উঠবে এবং নিজের কর্ম অনুযায়ী শাস্তি প্রাপ্ত হবে। আর বেহেশ্ত হল চিরস্থায়ী (সৎ কর্মকারীদের জন্য) এবং জাহান্নাম হল চিরস্থায়ী (অসৎ কর্মকারীদের জন্য)। (সিরায়ে হালাবী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩২১)
তিনি আরো বলেন : আমি আপনাদের জন্য এমন কিছু নিয়ে এসেছি যা মানুষের মধ্যে হতে আর কেউই তার আত্মীয়-স্বজনের জন্য আনেনি। আমি আপনাদের জন্য ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ নিয়ে এসেছি। আমার প্রভূ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আপনাদেরকে তাঁর প্রতি আহ্বান জানাই। আপনাদের মধ্যে হতে কে আমার সহযোগী (পৃষ্ঠপোষক) হবে, যাতে সে আপনাদের মাঝে আমার ভাই, ওসী ও স্থলাভিষিক্ত হবে?
এ পর্যন্ত বলার পর নিরাবতা সমগ্র মজলিসে ছেয়ে গেলো। সবাই গভীর চিন্তায় মগ্ন হল। হঠাৎ আলী (আঃ) উঠে দাঁড়ালেন, সেদিন তার বয়স ছিল ১৩ বা ১৫ বছর। তিনি নিরবতা ভেঙ্গে বললেন : হে আল্লাহর নবী আমি আপনার সহযোগী হব। রাসূল (সঃ) তাঁকে বসতে বললেন। এভাবে তিনি নিজের কথাকে তিনবার পূনরাবৃত্তি করলেন। সেই ১৫ বছরের কিশোর ব্যতীত আর কেউই রাসূলের (সঃ) কথার জবাব দিল না। এমতাবস্থায় তিনি তাঁর আত্মীয় স্বজনদের দিকে তাকিয়ে বললেন : হে লোকসকল! এই কিশোর হল তোমাদের মাঝে আমার ওসী ও স্থলাভিষিক্ত। তার কথা শোনো এবং তাকে অনুসরণ কর। সভা ভেঙ্গে গেলো। উপস্থিত সকলে উপহাস ব্যাঞ্জক মুখে আবু তালিবকে উদ্দেশ্য করে বলল : মুহাম্মাদ তোমাকে নির্দেশ দিয়েছে যেন তুমি তোমার পুত্রের অনুসরণ করো এবং তার নির্দেশ পালন কর! আর তাকে তোমার চেয়ে বড় হিসেবে পরিচয় করিয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বাল, ১ম খণ্ড, পৃ. ১১১; তারিখে কামেল, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪০-৪১; শারহে নাহজুল বালাগাহ, ইবনে আবিল হাদীদ, ১৩তম খণ্ড, পৃ. ২১০-২২১)
যাই হোক বিষয়টির জন্য খুবই বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন। যা কিছু এখানে লিপিবদ্ধ হয়েছে তা অধিকাংশ মুফাসসির ও ঐতিহাসিকগণের লেখার সারসংক্ষেপ। মুফাসসির ও ঐতিহাসিকগণ বিভিন্ন বিবরণে ও বিভিন্ন রাবী মারফত এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন।
উক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে পাঠক মহোদয় নিশ্চিত বুঝতে পেরেছে যে, ইসলামের প্রথম প্রকাশ্যে দাওয়াত প্রদানের দিনই হযরত মহানবী (সঃ) নিজের ওসী ও স্থলাভিষিক্ত হিসেবে হযরত আলী (আঃ) কে নির্বাচন করেছিলেন।
অতএব, পাঠক মহোদয়ের উচিত নিজেকে প্রশ্ন করা যে, খেলাফতের বিষয়ে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য আর কোন দলিল উপস্থাপনের প্রয়োজন কি এখানে আছে?
সূত্রঃ বার্তা সংস্থা আবনা
নতুন কমেন্ট যুক্ত করুন